অনুতাপ -জাকিয়া সুলতানা | আমাদের সেরা গল্প

অনুতাপ -জাকিয়া সুলতানা | আমাদের সেরা গল্প
অনুতাপ -জাকিয়া সুলতানা

লেক অন্টারিও’র পাশে ওয়াটার টাউনের একটা বাসায় জামিলের হাতের চড় খেয়ে লতা পড়ে গেল সিমেন্টের বাঁধানো মেঝেতে। গালে হাত বুলোতে বুলোতে উঠে দাঁড়াল প্রায় সাথে সাথেই। ওর পড়ে যাওয়া এবং উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান এত স্বল্প ছিল যে অন্য কেউ দেখলে বুঝে যেত লতা অভ্যস্ত এভাবে মার খেয়ে। জামিল বেরিয়ে চলে গেল। যাবার আগে যে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেল সেটা যেন অবোধ ছেলেটার কানে না পৌঁছায় তার জন্য ছেলের দুকান দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছিল ও।  জামিলের সাথে বিয়ের বয়স ওর তিন বছর প্রায়। এই তিন বছরই বলা চলে  এভাবে মার খেয়ে আসছে লতা।  

-মাম্মা তুমি আমার কান চেপে ধরেছ কেন ?

আধা ইংরেজি, আধা বাংলায় অবোধ বাচ্চাটা বলে উঠল। ওর কথা শুনে লতার খেয়াল হল জামিল বেরিয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েছে। ছেলের কান দুটো থেকে নিজের হাত দুটো সরিয়ে নিল। এমন সময়ে  মেসেঞ্জারে কল আসার শব্দে আরও একটু বেশী সচকিত হল ও। জানে এ সময় কে কল দিতে পারে। না দেখেই সামনের ডেস্কে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল কেটে দিল। আরও কয়েকবার কল এল ওর মেসেঞ্জারে। না, ধরবে না ও; কথাও বলবে না। মায়ের ওপরে ক্ষুব্ধ অভিমানে চোখে পানি চলে এল।

-মাম্মা কাঁদে না।

প্রতিবার বাচ্চাটা এভাবে স্বান্তনা দেয় ওকে। কিন্তু কখনো ওর  কোন প্রতিক্রিয়া হয় না।  আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদল অনেকক্ষণ।    

                 সারিকা রহমান বুঝলেন না মেয়ে কল রিসিভ করছেনা কেন ? বার বার কল দিয়েই যাচ্ছেন। কিন্তু মেয়ে নীরবে কেটে দিচ্ছে। দুশ্চিন্তায় ভুরুর মাঝে ভাঁজ পড়ল উনার।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে  ছেলে আমেরিকায় বড় চাকরি করে - শুধু এটুকু শুনেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে ভুল করেছেন। বিয়ের দুবছরের মাথায় শুনেছিলেন ঢাকা নয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছে উনার মেয়ে-জামাই। এত বড় একটা মিথ্যা দিয়ে মেয়ের জীবন শুরু হয়েছিল বলে তখনই  মনে ‘কু’ গাইত উনার। আর এখন তো ..। সেবার মিসেস জাহানারা এসেছিলেন অন্টারিও’তে ছেলের বাসা থেকে ঘুরে। উনার মুখেই শুনেছিলেন ছেলের অত্যাচারের কাহিনী । বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু ইদানীং কেন যেন মনে হয় মিসেস জাহানারার কথাই সত্যি।   

                 খোলা দরজা দিয়ে একটা মুখ উঁকি দিল,

-দরজা খোলা রেখেছ কেন লতা ?

পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। সীমা ভাবী , আম্মুর কলিগ জাহানারা আন্টির  ছেলের বৌ।

-বন্ধ করতে ভুলে গেছি ভাবী। জামিল বাইরে গেল তো মাত্র..

ওর বিকৃত কণ্ঠ সীমার কানে যেতে এটা বুঝতে অসুবিধা হল না যে আজো স্বামীর হাতে মার খেয়েছে।

-এত সহ্য কর কেন বল তো ! পুলিশে একটা কমপ্লেন দিলেই..

-না না ও কথা মুখেও এনো না ভাবী !

সীমা থেমে গেল। সদ্য বাবাকে হারিয়েছে মেয়েটা। পুলিশে কমপ্লেন করলে মেয়েটার উপরে অত্যাচার আরও বাড়বে ওর উপর। এটা বুঝতে অসুবিধা হলনা একটুও। লতার বাসার দরজা টেনে দিল ও – ভেতর থেকে অটোলক হয়ে গেলে উপরে উঠে এল। ঠিক লতার পাশে থাকেনা ও ; লতার এক ফ্লোর উপরে থাকে। লতা যেখানে থাকে সেটাকে মাটির নীচের ঘর বলে। একপাশে সার দিয়ে অনেকগুলো ওয়াশিং মেশিন রাখা থাকে। সপ্তাহে একদিন পুরো এপার্টমেন্টের সবাই কাপড় কাচে। বাড়তি জায়গাটাতে কোনমতে এক রুমের একটা বাসা  - যেটায় লতারা থাকে। রুমটায় একটা জানালা পর্যন্ত নেই। ছোট্ট একটা ভেন্টিলেটর আছে। সেটা দিয়ে দিনের বেলা শুধু কোনমতে  একটু আলো রুমে ঢোকার মত পথ  থাকে।

             নিজের রুমে বসে ভাবছিল সীমা – আমেরিকায় থাকে, ভাল চাকরি করে ছেলে – এসব শুনে কত মা-বাবা পাগল হয়ে মেয়ের বিয়ে দেন। বিয়ে হয়ে যাবার পর বেশীরভাগ মেয়েরই অবস্থা হয় লতার মত। সীমা এটাও শুনেছে জামিলের এটা দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বৌ’ও বাঙ্গালী ছিল। কিন্তু ওর স্বভাবের কারণে ওকে ছেড়ে চলে যায় মেয়েটা। লতা সেটাও জানেনা, আর ও নিজেও আগ বাড়িয়ে বলতে যায়নি কখনো।  কি দরকার বলার ! আর ওর স্বামী জামিল ! কাজ করে একটা সুপারশপে সেলসম্যান হিসাবে। কিন্তু বিয়ের কথা হওয়ার  সময় লতা জানত জামিল একজন ইঞ্জিনীয়ার , কাজ করে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে। একটু যাচাই-বাছাই করে দেখার প্রয়োজনও মনে করেননি লতার অভিবাবকেরা। আশ্চর্য লাগে সীমার পুরো কাছে বিষয়টা । প্রবাসে থাকা পাত্র মানেই একখণ্ড হীরের খনি – বাংলাদেশের অধিকাংশ অভিবাবকের ধারণা এরকম। এখন লতার অভিভাবকও কষ্ট পাচ্ছেন, পাচ্ছে লতাও।

                পর পর কয়েকদিন সারিকা মেসেঞ্জারে পেলেন না লতাকে। একদিন অফিসে বসে ফোনকল দিলেন মেয়েকে। কয়েকবার কেটে দেওয়ার পর একবার ধরা গলায় কলটা রিসিভ করল লতা। আজো মেরেছে জামিল ওকে।

-কি বলবে বল।

সরাসরি বলল ও।

-তোমার কণ্ঠ এরকম লাগছে কেন ?

-তাতে তোমার কি এসে যায় ?

-এভাবে কথা বলছ কেন তুমি মামণি !

-সেটা আমার চেয়ে তুমি ভাল করে জানো।

-আমি ! কি জানি আমি !!

অবাক কণ্ঠে বললেন লতার আম্মু। কিন্তু উত্তর পাওয়ার আগেই ওপাশ থেকে ফোনের লাইনটা কেটে গিয়েছে। সকালে যে গালিটা দিয়ে গেল জামিল সেটা মনে মনে আওড়াল কয়েকবার লতা। আজকাল জামিল প্রায়ই ওর মায়ের চরিত্র নিয়ে কথা তোলে। ও প্রতিবাদ করে না, কারণ প্রতিবাদ করার মত শক্ত ভিত ওর নেই। ব্যাপারটা সত্যি। অন্তত ওর ছোটবেলার স্মৃতি সেটা বলে। বাড়িতে কতটুকু সময় পেত ও মাকে। স্কুল থেকে ফিরে প্রায়ই দেখত মা বাড়ি নেই। বাবা ওকে খাইয়ে দিত, বেড়াতে নিয়ে যেত। মায়ের কথা জানতে চাইলে বাবার অসহায় চেহারাটা এখনো  যেন দেখতে পায় ও। বাবা ছিল ওর কাছে বটগাছের ছায়ার মত। সেই বাবাও..। আর থাকতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠল লতা। ভাগ্য ভাল আজ বুবুনটা বাসায় নেই। সীমা ভাবী সকালে এসে ওকে নিয়ে গিয়েছেন।

                সারিকা রহমানের অপরাধ-বোধ হয়। মেয়ের ইঙ্গিত বুঝতে মোটেই কষ্ট হয়নি ওঁর। কম বয়সের বেপরোয়া জীবনযাপন ওঁকে এখন ভাবায়। দুটো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়ার কষ্টটা এখন অনুভব  করেন উনি। মনে পড়ে মেয়ের কত বিয়ের প্রস্তাব আসত। কিন্তু যখন পাত্রপক্ষ ভাল করে খোঁজখবর করত মেয়ের ঠিকুজি-কুলুজি। তখনই আর এগোত না বিয়ের কথা। কারণ মায়ের বেপরোয়া  জীবনযাপন এর গল্পগুলো ছোট্ট শহরটায় লুকিয়ে থাকত না। বরং আকাশে চাঁদ-সূর্য ওঠার মতই সত্য ছিল সেগুলো। দেওয়ালে সাগরের একটা ছবি বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। এটা ছিল শুধু লোকদেখানো শোক অর। আসলে খুব বেশী কষ্ট পাননি উনি সাগরের মৃত্যুতে। বরং একটা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিলেন, যদিও ওঁর বোহেমিয়ান- জীবনযাপন নিয়ে ভালমানুষ সাগর কখনো কিছু বলেনি। তবু কেন জানি নিজেকে স্বাধীন ভাবতে ভালবাসতেন উনি। রুপা এসেছিল সাগরের মৃত্যুর পর, সাথে বরকএ নিয়ে। ওদের নাস্তা দেওয়ার জন্য রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে কানে গিয়েছিল ওঁর রুপার স্বামী’র কণ্ঠ,

-She is too much shoked.

রুপা নীরবে বসেছিল । ঐ সময়ের রুপার মানসিক অবস্থাও উনার আন্দাজ করে নিতে একটুও অসুবিধা হয়নি। রুপা না পারছিল স্বামীর কথার প্রতিবাদ করতে, না পারছিল বান্ধবীর নামে  করতে। ছবিটার সামনে যেয়ে দাঁড়ালেন। প্রতিদিনই একবার দাঁড়ান। কিন্তু আজকের দাঁড়ানোটা অন্যরকম। আজ আসলেই উনি কষ্ট পাচ্ছেন মনে মনে। বলতে লাগলেন ধীরে ধীরে , যেন জীবিত সাগরের পাশে বসে কথা বলছেন এমনভাবে,         

-তুমি তো জানতে আমার বোহেমিয়ান জীবনযাপনের কথা। কেন বাধা দাওনি তুমি ? তোমাদের সবাইকে আমি ঠকিয়েছি। ফল হিসাবে কি পেয়েছি বল ? আমার মেয়ের অত্যাচারতি জীবন। সারা জীবন ওকে এই কষ্ট বয়ে যেতে হবে।

লতার বিয়ে যখন এখানে কিছুতেই দিতে পারছিলেন না, তখন সারিকাই খুঁজে পেয়ে জামিলের সাথে বিয়ে দেন। ও ভাল কোন চাকরি করে না সেট উনিই একমাত্র জানতেন। সাগরকেও বুঝতে দেননি। সাগর জানলে এ বিয়ে কিছুতেই হতে দিত না।  কিন্তু জামিল এরকম অত্যাচার করবে মেয়েকে এটা কখনো ভাবতে পারননি। স্বামীর ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। লোক দেখানো কান্না  সাগরের মৃত্যুর পর অনেক কেঁদেছেন, কিন্তু আজ সত্যি সত্যি কাঁদছেন – একমাত্র মেয়ের দুঃখে – যার জন্য তিনিই দায়ী। কারণ ফোনে মেয়ের কণ্ঠ থেকে খুব ধীরে বেরনো বাক্যটা কান এড়িয়ে যায়নি উনার। যেটা বলে জামিল প্রায়ই ওর গায়ে হাত তোলে।

জাকিয়া সুলতানা