অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন ধরার পর ৪০ মিনিট ধরে নড়তে থাকে । MV Abhijan-10 

অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন ধরার পর ৪০ মিনিট ধরে নড়তে থাকে । MV Abhijan-10 

MV Abhijan-10  আগুন লাগার পরপরই তীরে ছুটে এলে এমন ভয়াবহ ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত। সেক্ষেত্রে সবাই বেঁচে যেতে পারত বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবিতরা জানিয়েছেন।



বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, লঞ্চটি বরিশাল বন্দর অতিক্রম করে বেলা ২টায়। ঠিক 20-25 মিনিট পর সুগন্ধা নদীর দপদপিয়া পয়েন্ট পার হওয়ার সময় বরগুনা থেকে আসা রাশেদ নামে এক যাত্রী ইঞ্জিন রুমে আগুন দেখতে পান।



রাশেদ বলেন, আমি ইঞ্জিন রুমের পাশে বসে ছিলাম। দপদপিয়া পয়েন্ট পার হওয়ার পর ইঞ্জিন রুমে আগুন দেখতে পেলাম।

কিন্তু, লঞ্চটি চলতে থাকে যখন ফেরির কর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিল। প্রায় 40-45 মিনিট এভাবে চলার পর হঠাৎ আগুন পুরো জাহাজটিকে গ্রাস করে।

এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার সাইফুল আহসান বাদল বলেন, নাবিকের অদক্ষতা এক্ষেত্রে বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের পর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রাখলে হয়তো এত বড় ট্র্যাজেডি হতো। হত না।"

শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বরগুনার ধলুয়া এলাকার বাসিন্দা কালু মিয়া নামে আরেক যাত্রী বলেন, ইঞ্জিন রুমের পাশে সাত ব্যারেল তেল ছিল। আগুনের উত্তাপে তা পুরো লঞ্চটিকে গ্রাস করে। আগুন এতটাই দ্রুত ছিল যে তৃতীয় তলার কেবিনের বেশির ভাগ যাত্রীই বের হওয়ার সময় পাননি।”

প্রচণ্ড তাপের কারণে লঞ্চটির স্টিলের কাঠামো প্রসারিত হতে শুরু করে এবং দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যাত্রীরা নদীতেও ঝাঁপ দিতে পারেনি বলে জানান কালু মিয়া।

ওই লঞ্চের নিয়মিত যাত্রী কামরুল হাসান বলেন, "বৃহস্পতিবার বিকেলে লঞ্চটি ঢাকা সদর ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে লঞ্চের ইঞ্জিন থেকে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। এমন শব্দ আগে কখনো শুনিনি।"

তারপর, বিস্ফোরণের পরে যখন আগুন ছড়িয়ে পড়ে, তখন আমাদের কিছুই করার ছিল না।

নিখোঁজ যাত্রীর সংখ্যা এখনও জানা যায়নি
অগ্নিকাণ্ডের সময় ‘অভিযান-১০’ লঞ্চে কতজন যাত্রী ছিলেন তা এখনও জানা যায়নি। তবে লঞ্চের মালিক হুম জালাল শেখ জানান, লঞ্চটিতে ৩০০-৩৫০ জন যাত্রী ছিল।

বরিশালের বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক এসএম আজগর আলীও দাবি করেছেন যে লঞ্চটি প্রায় ৩১০ জন যাত্রী নিয়ে বরগুনার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছে।

এদিকে লঞ্চে আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানান, লঞ্চটিতে দেড় হাজারের বেশি যাত্রী ছিল।

যদিও শুক্রবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত 70 জন পুরুষ ও মহিলাকে এসবিএমসিএইচে ভর্তি করা হয়েছিল এবং 37 জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, তবে লঞ্চের বাকি যাত্রীদের কী হয়েছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়।

ঝালকাঠিতে সুগন্ধা নদীর তীরে নোঙর করা লঞ্চ থেকে বহু যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিহত ৩৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। তাদের মরদেহ ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

বরগুনার ধলুয়া এলাকার বাসিন্দা দুলাল সরদার বলেন, সকালে বাসা থেকে ফোনে দুর্ঘটনার খবর পাই। পরে দেখলাম লঞ্চে থাকা আমার নয়জন আত্মীয়ের মধ্যে ছয়জন নিখোঁজ রয়েছে।”

লঞ্চে নারায়ণগঞ্জ থেকে বরগুনার উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া ১৩ বছরের রকিবুলের খোঁজে বরিশালে আসা পাথরঘাটার শাহজালাল হাওলাদার বলেন, ঝালকাঠিতে রকিবুলের কোনো হদিস না পাওয়ায় বরিশালে এসেছি।

SBMCH এ পরিস্থিতি
শুক্রবার সকাল থেকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (এসবিএমসিএইচ) বেশ কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে ভর্তি করা হচ্ছে। এসবিএমসিএইচের সহকারী পরিচালক মনিরুজ্জামান শাহিন বলেন, সকাল ৮টা পর্যন্ত আমরা ৬৬ জন রোগীকে ভর্তি করেছি।

মনিরুজ্জামান বলেন, তাদের মধ্যে ১৮ জন নারী। "আমাদের কাছে কোনো ডেডিকেটেড বার্ন ইউনিট না থাকায় তিনজন নারী ও চারজন পুরুষকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।"

এসময় আহতদের মধ্যে দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে দগ্ধ অবস্থায় মারা যান।

পোড়ানো বন্ধ থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গত সাত মাস ধরে তা বন্ধ রয়েছে। এসবিএমসিএইচের সার্জারি ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে জানান এসবিএমসিএইচের নার্স রবিউল ইসলাম।

পরিচালক এইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অগ্নিদগ্ধ রোগীদের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকার চিকিৎসকরা বরিশালে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে ঝালকাঠিতে ‘অভিযান-১০’ লঞ্চ অগ্নিকাণ্ডে আহতদের দেখতে শুক্রবার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (এসবিএমসিএইচ) পরিদর্শন করেছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালি
য়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

র‌্যাব সদর দফতরের এএসপি (মিডিয়া) ইমরান খান বলেন, র‌্যাব ডিজির নির্দেশে একটি হেলিকপ্টার বরিশালে পৌঁছে এবং গুরুতর আহত দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যায়।



‘অভিযান-১০’ লঞ্চে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নেই 
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া প্রায় সকল লঞ্চের যাত্রী ইঞ্জিন রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে দাবি করলেও লঞ্চের মালিক হুম জালাল শেখ তা মানতে রাজি হননি।

মাত্র এক মাস আগে লঞ্চটিতে ইঞ্জিন বসানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ইঞ্জিন বসানোর পর ঢাকা-বরিশাল রুটে চারটি রাউন্ড ট্রিপ করা হয়।

যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জালাল বলেন, লঞ্চটিতে অন্তত ২১টি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ছিল, কিন্তু আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে সেগুলো ব্যবহারের সময় ছিল না।

লঞ্চটিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না দাবি করে তিনি বলেন, ইঞ্জিনে আগুন লাগলে আগুন কখনো পুরো জাহাজে ছড়িয়ে পড়বে না। বিস্ফোরণের পর দ্বিতীয় তলা থেকে ইঞ্জিন ও কেবিনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে।