আশার সমান | জাকিয়া সুলতানা | আমাদের সেরা গল্প

আশার সমান | জাকিয়া সুলতানা | আমাদের সেরা গল্প

উপসংহার - ছোটবেলায় আদরে বড় হওয়া একটা মেয়েকে পরবর্তী জীবনে কতটা সংগ্রামী জিবন-যাপন করতে হয়েছে তারই একটা চিত্র এই গল্পের মূল বিসয়। আশা করি সবার ভাল লাগবে।
 

আশার সমান - 

                            -একা একা কি করছিস ? 

পেছন থেকে আচমকা প্রশ্নটা শুনে একটু চমকে উঠল মিলা। তারপর ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল হাসিব। একজন ভাল বন্ধু বলতে যা বোঝায় ওর মধ্যে তার সব ক'টা গুণই ওর মধ্যে আছে। মিলা হাসিবকে যত দেখে তত অবাক হয়। এত ভাল মানুষ হয় কি করে ! হাসি ফুটল ওর মুখে। বলল,

-শরৎচন্দ্রের কথা ভাবছি।

-আরে তুই মানুষটা এমন বেরসিক কেনরে !

-মানে !!

অবাক হয়ে মিলা বলল।

-বেরসিক নয়?

-নাহ !!!

হাসিবের প্রশ্নের উত্তরে মিলা বলে উঠল। আর ওর কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল কিছুদিন আগেও ওর যে প্রবল আত্মবিশ্বাস ছিল ঠিক সেটা। তবু যে ঠাট্টাটা একটু আগে করতে চেয়েছিল সেটা করার লোভটা সংবরণ করতে পারল না। বলে উঠল,

-আমরা এত ইয়ং বুড়ো থাকতে কোথাকার শরৎচন্দ্রের কথা ভেবে মরছিস তুই !

-সে তুই বুঝবি না।

-ঠিক আছে, তুই তোর শরৎচন্দ্রের কথা ভাব। আমি একটু ওদিকে দেখি।

-হ্যাঁ দ্যাখ যা ; আমার কিন্তু একটায় লাঞ্চ চাই।

-ওকে জাহাঁপনা ।

বলে একটা বাও করে চলে গেল হাসিব। মিলা আবার শরৎচন্দ্রের কাছে চলে গেল। সম্প্রতি উনার একটা বইতে পড়েছে যে ব্রিটিশদের তৈরি করা রেললাইন এসে ভারতের বারোটা বাজয়ে দিয়েছিল। তখন এই উপমহাদেশ ছিল অবিভক্ত। বেগম রোকেয়াও বলেছেন 'সভ্যতাই মানুষের ধ্বংসের মূল'। আসলেই কি তাই !

                        -আপু।

কতক্ষণ ভাবনার জগতে ডুবে ছিল বলতে পারবেনা। ডাক শুনে দেখল শাহেদের বৌ।

-বুবু তুমি কখন এসেছ?

বয়সে ছোট হলেও আন্তরিকতার কারণে পলিকে ও 'বুবু' বলে সম্বোধন করে।

-এই তো এলাম মাত্র। তোমাকে খুঁজছিলাম এতক্ষণ ।

-ওহ! সরি গো !! তোমার অনেক পেরেশানি হল।   

ওকে জড়িয়ে ধরল পলি। তারপর বলল,

-তোমার সাথে তো আমার 'সরি' বলার মত সম্পর্ক নয়।

মনটা ভরে উঠল মিলার। এরা ওর পাশে আছে বলেই এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্নটা দেখতে পায় ও । দূর থেকে শাহেদ ওদেরকে দেখল। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস গোপন করল দেখে। ছাত্রজীবনের 'মিলা''র সাথে আজকের মিলার মিল বার করতে চেয়ে ব্যর্থ হল। জীবন এই উচ্ছ্বল মেয়েটার কাছে থেকে খুব বেশী দাম নিয়ে ফেলেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাটা ..।

-এই কি ভাবছিস দোস্ত?

-নাহ! কিছু না !!

সামনে একজন ওদের দলের সদস্য দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করেছিল। ওকে এড়িয়ে রান্নার জায়গায় গেল। সকালের নাস্তার পর্ব চুকেবুকে গেছে। এখন দুপুরের খাবারের আয়োজন চলছে।  একটু তদারকি করা দরকার। অবশ্য হাসিব আছে। যাকে ওরা বলে 'সর্ব বিষয়ে অভিজ্ঞ'। ও থাকাতে চিন্তার কিছু নেই। তবু পাশে থাকা উচিত। বেচারা একা কত সামলাবে !

                 বন্ধু এবং বন্ধু-পত্নী সবার ভালবাসায় সিক্ত হয়ে মিলা ফিরে এল বাসায়। লাঞ্চ করেই রওয়ানা দিয়েছিল। এরপর আর থাকতে ভাল লাগেনি। ওরাও মিলার মনের অবস্থা বিবেচনা করে জোর করেনি। বাসায় পৌঁছাতে তিনটে বেজে গেল। আজ আর কোন কাজ নেই। কাল থেকে নতুন অফিস। বন্ধুরা সবাই তৎপর হয়ে একটা চাকরি খুঁজে দিয়েছে। যা বেতন পাবে বাচ্চা দুটো নিয়ে খেয়ে পরে বাঁচা যাবে – এই যা স্বস্তি ওর। বাচ্চারা ঘুমিয়ে। একটু দেখল দুজনকেই। তারপর এক কাপ কফি নিয়ে বারান্দায় দাঁড়াল। এই একটা জায়গা যেখানে এসে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। তা না হলে এই বাসাটাকে একটা 'গুদাম' ছাড়া ওর আর কিছু মনে হয়না। কফির কাপ শেষ হতে ঘরে এল একবার। বিছানার পাশের টেবিলের চিঠিটা  চোখে পড়ল। গতকাল কুরিয়ার সার্ভিসে এসেছে। খুলে দেখা হয়নি এখনো। খামের উপর চেনা হাতের লেখাটা ওকে নিরুৎসাহিত করেছে খুলতে। আজো খোলার প্রবৃত্তি হল না। পেছনের দিন গুলোর কথা ভেসে উঠল চোখ আর মনের পর্দায়।

 '- আমি একটা চাকরি করি ? তুমি তো সংসারে তেমন কিছু দাওনা।

-ওহ ! তুমি করবে চাকরি !! কেন বড়লোক ভাই থাকতে আমার বৌকে বাড়ির বাইরে যেতে হবে কেন?

-কত মেয়েই তো চাকরি করছে এখন ।

-চাকরি করছে নাকি নষ্টামি?

মাস্টার্স পাশ একজন মানুষের মুখের ভাষা ওকে অবাক করেছিল। আর বলেনি চাকরি করার কথা।'

-আম্মু তুমি এসেছ!

মেয়েটা ঘুম ভেঙে উঠে এসেছে। ঘুম ঘুম, ফোলা ফোলা চেহারাটা মুখটাকে কমনীয় করে তুলেছে।

-মামণি, একটু আগে এসেছি।

-উ। ডাকোনি কেন আমাকে ?

বলে ওর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ল আবার। মিলা মেয়ের নরম রেশমের মত চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।    

                অফিসে মন দিয়ে একটা ফাইল দেখছিল হাসিব। আচমকা ফোনের আওয়াজে চমকে উঠে চোখ ফেরাল ফাইল থেকে। সামনে থাকা টি এন্ড টি ফোনে চোখ গেল ওর। ফোন-সেটের স্ক্রিনের উপরে অচেনা নম্বর। কে ! রিসিভার তুলবে কিনা একবার ভাবল। পরক্ষনেই কি মনে হতে তুলে কানে ঠেকিয়ে বলল,

-হ্যালো।

-হাসিব, আমি মিলা বলছি।

-ওহ! তুই !! বল, কি বলবি?

-নকীব চিঠি পাঠিয়েছে একটা।

-উকিল নোটিশ জাতীয় কিছু নাকিরে ?

-নাহ! সে'রকম কিছু নয়।

-তবে?

-আবার আমার কাছে আসতে চায়।

চমকে উঠল হাসিব। মিলা  ডিভোর্স  দেওয়ার তিন মাস পেরোয়নি এখনো। এরমধ্যে কত কষ্ট করে মিলা বাসা বদলাতে বাধ্য হল। হাসিবরা সবাই টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিল।

-পাষণ্ড একটা!

মনে মনে উচ্চারণ করল ও। আজীবন বিলাসিতায় বড় হওয়া মেয়েটাকে কি কষ্টই না দিয়েছে নকীব। মিলা ডিভোর্স স্যুট ফাইল করলে রেগে যেয়ে সাবেক বাসাটা  ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দিয়েছিল। মাথায় হাত পড়েছিল মিলার। ছোট্ট দুটো বাচ্চা নিয়ে কি করবে, কোথায় যাবে – কোন কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না। শেষে হাসিবদের স্মরণাপন্ন হয়েছিল লাজুক মেয়েটা।  আর সবে বাসা বদলে, একটা চাকরিতে একটু থিতু হয়ে বসেছে আর তখনই কিনা..
নতুন চাকরি, নতুন পরিবেশে মিলা নিজেকে মানিয়ে নিল সহজেই। মানিয়ে নেওয়ার এবং অন্যকে আপন করে নেওয়ার সহজাত একটা প্রবৃত্তি আছে ওর মাঝে। এখানেও ব্যতিক্রম  হলনা। অনেকগুলো মেয়ে কাজ করে ওর অধীনে। কেউ ভাল কাজ জানে, আবার কেউ কিছুই পারেনা। মিলা শান্তভাবে সবাইকে কাজ শেখায়। অফিসে ওর একটা গ্রহণঅ-যোগ্যতা তৈরি হল খুব সহজেই। কিন্তু বামের বিধি বামেই থাকল মিলার, ডান দিকে আসার কোন প্রয়োজনই মনে করলনা। অফিসের একটা শূন্য পদে যোগ দিল নকীবের এক  বন্ধু ; যে ছিল মিলার ডিভোর্সের সিদ্ধান্তের ঘোর-বিরোধী। অফিসের পরিবেশ দুর্বিষহ হয়ে উঠতে সময় লাগল না। কর্তৃপক্ষের তরফের একজনও  একদিন ডেকে  অপমান করল ওকে,

-আপনার জন্য 'অমুক' ক্লায়েন্ট হারালাম আমরা।

-স্যার ওটা তো রাজু  সাহেব..

-নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাবেন না।

-না, স্যার ..

-'নিজের দোষ নয়' এটা বলবেন তো !

অসহায় মিলা নির্বাক হয়ে যায়।  ক্রমে অফিসের পরিবেশের তিক্ততায় বিরক্ত হয়ে হাসিবের স্মরণাপন্ন হল আবার।

-কি করিরে এখন ?

হাসিব সব শুনে নীরবে বসে থাকে কিছুক্ষণ। ভেসে উঠে ছাত্রজীবনের দিনের কথা। কত সুখী ছিল মিলা ! মা-বাবার আদরে একমাত্র মেয়েটা ওদেরকে কত সাহায্য করেছে টাকা দিয়ে। আর আজ সেই মেয়েকেই ওদের কাছে টাকা নিয়ে বাসা বদলাতে হয়েছে, চাকরিও খুঁজে দিয়েছে ওদের কোন এক ক্ষমতায় থাকা বন্ধু। ডিভোর্স এবং ডিভোর্সের পরের তিক্ততার ক্ষত মন থেকে মুছে ফেলে কেবল একটু  কিন্তু এখন ঘরে ঢুকেছে আরেক বিপদ। অনেকক্ষণ হাসিবকে নীরব হয়ে থাকতে দেখে মিলা বুঝল ওর মনের অবস্থা। বলল,

-তুই ভাবিস নারে!

-ভাববনা !!

কোনমতে বলতে পারল হাসিব।

-হ্যাঁ, ভাববি না'ই তো।

হাসিব আবার কোন কথা খুঁজে পেলনা। 

-আমি অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ শিখেছিলাম। এখন কিছু কিছু কাজ পাচ্ছি। সেটা দিয়েই তিনটা জীবন চালিয়ে নিব আমি।

লড়াকু মেয়েটার মনের জোর হাসিবের মধ্যেও সংক্রমিত হল।

-হ্যাঁ, চলতেই হবে তোর জীবন । আমরাও তোকে কাজ দিব মাঝে মাঝে।

-দিস।

এত কষ্টেও হেসে ফেলল মিলা।

-জানিস ! আমার মায়ের সম্পত্তির ভাগটা পেলেও আজ এই সমস্যায় পড়তে হতনা আমাকে।
মিলার দুই ভাই পৈতৃক এবং মাত্রিক সব সম্পত্তি থেকেই ওকে বঞ্চিত করেছিল মা মারা যাবার পর। বাবা আগেই গত হয়েছিলেন। উনি ছেলেদের হাতে মেয়ের সব ভার দিয়েছিলেন মারা যাবার আগে। ভার নিয়েছিল মিলার ভাইয়েরা। কোনমতে একটা বিয়ে ধরেবেঁধে  দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সেরেছিল। আর মা মারা যাবার পর তো একরকম জোর করেই সব সম্পত্তি দখল করে নিয়েছিল দুজন।

               কম্পিউটারে ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ করে অল্প অল্প আয় হতে শুরু হল মিলার। ধীরে ধীরে বাড়ছে – কাজ আর আয় দুটোই। এভাবে চললে কিছুদিন পর বাসা ভাড়া শোধ করে দিতে পারবে। যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিল ওর বন্ধুরা সেই প্রতিষ্ঠানেরই একজন পরিচালকের নির্দেশে মিলা যতদিন বাসা ভাড়া দেওয়ার মত আয় করতে না পারবে ততদিন বাসা ভাড়া নিতে নিষেধ করেছেন এপার্টমেন্ট মালিক সমিতিকে। সে'রকম আয়ও আসতে লাগল দুই মাস পর থেকে। আগে ও ভাড়ার টাকা দিয়ে দেয়। তারপর যে টাকা আসে সেটা দিয়ে সংসারের বাজার করে। বাজার বলতে চালডাল, ডিম , সাবান – যেগুলো না হলেই নয় সেগুলো। বাচ্চাদের কষ্ট দেখলে বুকটা ব্যথায় মুচড়ে ওঠে। কিন্তু তারপরেই সাহসে বুক বাঁধে । ওকে এই বাধাটুকুও পার করতে হবে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস ও সেটা পারবে। ওদের মেনুতে ডিম রাখে রোজ। মুরগী বা মাছ দিতে পারেনা। সামনের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে আবার ওর বাচ্চাদের ও ডিম,দুধ , মাছ – সবই খেতে দিচ্ছে। এই স্বপ্ন নিয়েই যে বেঁচে থাকে মানুষ। কারণ একজন মানুষ যে তার আশার সমান বড় ; তাই মিলাকে এ যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।

ছোট গল্প,

লেখক - জাকিয়া সুলতানা।