লিভারকে সুস্থ রাখবে কোন কোন খাবার Liver Health Tips

লিভারকে সুস্থ রাখবে কোন কোন খাবার  Liver Health Tips

মানুষ যে সমস্ত ফ্যাট, প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করে তা পরিচালনার জন্য কোন অঙ্গটি কাজ করে জানেন কি? লিভার এর কথা মাথায় আসলো? জি, ঠিকই ধরেছেন  লিভার বা যকৃত মানব দেহের শারীরিক ক্রিয়াকলাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য ফ্যাট এবং প্রোটিনের উত্পাদন নিয়ন্ত্রণ করে। এটিকে দেহের রাসায়নিক গবেষণাগার বলা হয়ে থাকে কারণ শরীরের অধিকাংশ রাসায়নিক বিক্রিয়া এই লিভার বা যকৃতেই হয়ে থাকে। একটি রোগাক্রান্ত লিভার নানান বিপাকীয় ব্যাধি সৃষ্টি করে। দেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হল এই লিভার বা যকৃত। কিভাবে সুস্থ রাখবেন এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে?  এমন অনেক খাবার এবং পানীয় রয়েছে যা একজন ব্যক্তির লিভার বা যকৃতকে রোগাক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।   চলুন জেনে নেয়া যাক সেগুলো কি কি এবং কিভাবে কাজ করে!



 

লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকরী শীর্ষ খাবার এবং পানীয় গুলো হল (Liver Health)  

১। কফি (Coffee):

কফিকে লিভারের(Liver) জন্য ভাল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা , কারণ গবেষণায়  দেখা যায় এটি ফ্যাটি লিভার রোগের মতো সমস্যা থেকে লিভারকে(Liver) রক্ষা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের  একটি সমীক্ষার পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, দৈনিক কফি খাওয়া দীর্ঘস্থায়ী লিভার রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এটি লিভারকে ক্ষতিকর অবস্থা থেকেও রক্ষা করতে পারে,(যেমন লিভার ক্যান্সার) এছাড়াও কফি লিভারে ফ্যাট জমা কমায় বলে আরও একটি গবেষণা থেকে জানা যায়। কফি লিভারে প্রতিরক্ষামূলক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও বাড়ায়। এতে থাকা যৌগগুলি লিভারের এনজাইমগুলোর মাধ্যমে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থগুলোকে শরীর থেকে বের করে দিতে সহায়তা করে।



 

২। রসুন  (Garlic):

২০১৬  সালের একটি ছোট গবেষণা থেকে জানা যায় , রসুনের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি ক্যাপসুল খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শরীরের ওজন এবং শরীরের চর্বি কমাতে পারে বিশেষ করে যারা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) এর রোগী তাদের অন্য কোন শারীরিক ক্ষতি করা ছাড়াই এটি কাজ করে।   

 

৩। জাম্বুরা (Grapefruit):

জাম্বুরাতে দুটি প্রাথমিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে: নারিনজিন এবং নারিনজেনিন। এগুলি প্রদাহ হ্রাস করে এবং লিভারের কোষগুলিকে রক্ষা করে যা যকৃতকে আঘাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে।

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় প্রমানিত হয়, নারিনজিন অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস করে অ্যালকোহল-প্ররোচিত লিভার স্টেটোসিস থেকে রক্ষা করতে পারে।



 

৪। ফ্যাটি ফিশ বা চর্বিযুক্ত মাছ (Fatty fish):

চর্বিযুক্ত মাছ এবং মাছের তেল (ওমেগা ৩ ও ৬) গ্রহণ করার মাধ্যমে  নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) এর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো সম্ভব।

চর্বিযুক্ত মাছ ওমেগা -3 ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ, যা ভাল ফ্যাট যা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। এই চর্বিগুলি লিভারের স্বাস্থ্য রক্ষায় বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে, কারণ এরা অতিরিক্ত চর্বি বা ফ্যাট জমা হওয়া প্রতিরোধ করে এবং লিভারে এনজাইমের মাত্রা বজায় রাখে।   

 

৫। বাদাম (Nut)

বাদাম খাওয়া লিভারকে সুস্থ রাখতে এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)  থেকে  লিভার বা যকৃতকে  রক্ষা করার আরেকটি সহজ উপায়।

বাদামে সাধারণত অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এই যৌগগুলি NAFLD প্রতিরোধ করতে এবং প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে থাকে।

 

৬। অলিভ অয়েল (Olive oil):

অত্যধিক ফ্যাট জাতীয় খাদ্য লিভারের জন্য ভাল নয়। অলিভ অয়েল অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে এবং লিভারের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে এবং এর কারণটি হল এই তেলে থাকা উচ্চ মাত্রার অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড।

 

৭। বীটরুটের রস (Beetroot juice)

এটি যকৃতকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি এবং প্রদাহ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে, যদিও এর প্রাকৃতিক ডিটক্সিফিকেশন এনজাইমগুলি বৃদ্ধি করে।

 

এতো সময় তো জানলাম কি কি খাবার লিভার বা যকৃত এর জন্য অত্যন্ত উপকারী! এখন চলুন জেনে নেয়া যাক কোন কোন খাবারে আপনার লিভার

রোগাক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে।

 

লিভারের সুস্বাস্থ্যের জন্য কোন কোন খাবার এড়িয়ে চলবেনঃ

 

সাধারণত, একজন মানুষের দৈনিক খাদ্যাভ্যাসে সুষম খাদ্যর উপস্থিতি লিভারকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। তবে কিছু খাবার এবং খাদ্য গোষ্ঠী রয়েছে যা প্রসেস বা রাসায়নিকভাবে ভেঙ্গে ফেলতে লিভার এর জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে এবং লিভার অকেজো হওয়ার মতো ঘটনা দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে:  

 

১। চর্বি বা ফ্যাটযুক্ত খাবার(Fatty foods):

অতিরিক্ত ভাজা পোড়া খাবার, ফাস্ট ফুড প্যাকেটজাত প্রসেস ফুড। এবং তাছাড়া চিপসেও অতিরিক্ত পরিমাণে ফ্যাট থাকতে পারে।  

 

২। স্টার্চি খাবার (Starchy foods):

কম ফাইবার, উচ্চ প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন রুটি, পাস্তা, কেক এবং বেকড পণ্য।

 

৩। চিনি এবং চিনিযুক্ত খাবার (sugary foods):

যেমন সিরিয়াল, বেকড পণ্য এবং ক্যান্ডি, অতিরিক্ত চিনি যুক্ত খাদ্য লিভারের উপর চাপ বৃদ্ধি করে। অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ ব্যবহার সীমিত করা এবং ফ্রুক্টোজ যুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং পানীয় এড়িয়ে  চলা এক্ষেত্রে বেশ উপকারী।

 

৪। লবণ (Salt):

অতিরিক্ত লবণ লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্থ করে।এক্ষেত্রে পাতে লবন একেবারেই না খাওয়া, টিনজাত মাংস বা শাকসবজি এড়ানো এবং লবণযুক্ত মাংস এড়িয়ে চলা উচিত।

 

৫। অ্যালকোহল (Alcohol):

এটি লিভারের রোগের সাথে অনেক বছর ধরে সম্পর্কিত। অত্যধিক অ্যালকোহল পান করার কারণে লিভারের কার্যক্ষমতা লোপ পায়, লিভার স্ফীত হয়ে যায় এবং লিভারের অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হয় যা লিভার সিরোসিস নামে পরিচিত।

 

 সঠিক ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাস দিয়ে লিভারের স্বাস্থ্যের উন্নতি করা কি সম্ভব?

গবেষণা পরামর্শ দেয় যে খাদ্যতালিকাগত অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যেমন বিটা ক্রিপ্টোক্সানথিন এবং অ্যাটাক্সানথিন, NAFLD প্রতিরোধ বা চিকিত্সার ক্ষেত্রে কার্যকর ভুমিকা রাখে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মানুষের বিপাক প্রক্রিয়ায় সব সময় ঘটে এবং এটি বার্ধক্য প্রক্রিয়ার একটি প্রাকৃতিক অংশ। যদি মানুষের লিভার অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলি না পায় তবে এটি স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেনা। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস লিভারের কোষগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে ফাইব্রোসিস এবং সিরোসিস হয়।

 

আরো পড়ুন: স্বাস্থ্য সচেতনতায় " আপেল সিডার "লিভার সুস্থ রাখবে কোন কোন খাবার ?

                                      স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উপর কিছু টিপস যা বিভ্রান্তি দূর করবে

                                                  সু সাস্থ্য কি ভাবে জীবনযাপন পরিবর্তন করে

 লিভারের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে এমন অন্য কোন পুষ্টি উপাদান আছে কি?

 

গবেষণায় দেখা গেছে যে ভিটামিন ই থেরাপি স্টেটোসিস (লিভারে চর্বির পরিমাণ) এবং প্রদাহ কমাতে কার্যকর যখন পিওগ্লিটাজোন এর (একটি টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ওষুধ) পাশাপাশি দেওয়া হয়। ভিটামিন ই আসলে NASH-এর ফার্মাকোলজিক্যাল চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয় কারণ এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তবে , ভিটামিন ই এর দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের সম্ভাব্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, (যেমন প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং হেমোরেজিক স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়)। অতএব, যকৃতকে রক্ষা বা নিরাময় করার জন্য ভিটামিন ই গ্রহণ করার আগে একজন যোগ্যতাসম্পন্ন পুষ্টি বিশেষজ্ঞ সাথে পরামর্শ করা ভাল।