সুখের সীমানায় । জাকিয়া সুলতানা । আমাদের সেরা

সুখের সীমানায় । জাকিয়া সুলতানা । আমাদের সেরা
সুখের সীমানায় , লেখক - জাকিয়া সুলতানা

মাহি ঠিক করেছে পরের ক্লাসগুলো  করবেনা। যেই ওর মনে এটা গেঁথে গেল আর  কিছুতেই পরের ক্লাসের উপর কোনভাবেই আগ্রহ ধরে রাখতে পারল না। বেরিয়ে গেল ফার্মেসি বিভাগের পেছনের সিঁড়ি দিয়ে। কার্জন হলের গেটে যেয়ে রিক্সা নিয়ে সোজা বাসায়।

আব্বু-আম্মু কেউ নেই অবশ্য এখন বাসায়। খালি বাসায় মুভি দেখবে তবু ক্লাস করবেনা। ক্লাস পালানোর অভ্যাসটা পুরনো মাহির। আগেও লুকিয়ে ক্লাস থেকে পালাত – স্কুল,কলেজ –সব জীবনেই কাজটা করেছে ও। কলেজে তো অল্পের জন্য নন-কলেজিয়েট হয়নি। আম্মুকে ডেকেছিল বাসা থেকে। ভাগ্যিস আম্মুর নম্বর দেওয়া থাকে স্কুল-কলেজ সব জায়গায়।

আম্মু ঠাণ্ডা মাথায় ওকে বাসায় এনে বুঝিয়েছিল। আব্বু সেসব এখনো জানেনা, আর জানবেও না কখনো। আর স্যাররাও  কিছু বলেন না। কারণ মাহি প্রতিবার রেকর্ড পরিমাণ নম্বর পায় রেজাল্টে। কাজেই কিছু বলার থাকেনা কারো। বাসায় ঢুকে ফ্রেশ হল আগে। ডাইনিং টেবিলে যেয়ে ভাত খেয়ে নিল। হট পটে ভাত-তরকারি থাকে । ও ক্লাস সেরে এসে খায় রোজ। আজো খেয়ে সবে বিছানায় গড়িয়েছে মুভি ডাউনলোড করবে বলে। স্মার্ট ফোনে ডাউনলোড করে স্মার্ট টিভিতে সংযোগ   প্রযুক্তি কত এগিয়েছে ! কিন্তু এই দুটো জিনিস প্রাপ্তির পেছনে আম্মুর অবদান আছে। আম্মু অনেক কষ্ট করে  টাকা জমিয়ে এস,এস,সি’র পর স্মার্ট ফোনটা আর এইচ,এস, সি পাশ করার পর স্মার্ট  টিভিটা কিনে দিয়েছে ওকে। ওরা তিন বেলা ভাত খায়। কারণ বাসায় কোন কাজের লোক নেই ; রুটি বানানো কষ্টের কাজ। আর তাছাড়া আম্মুর সময় নিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেনা।  দ্রব্যমূল্যের হঠাৎ ঊর্ধ্বগতিতে এই কাজের মেয়ে বিদায় করে এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।  

এখন আম্মুই সব কাজ করে। সকালে উঠে রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে দেয়, চালের সাথে ওটায় আলুও থাকে কয়েকটা। ভাত হলে ভর্তা করে নেয় আম্মু। সকালে আলুভর্তা আর ভাত, কোনদিন ডালভর্তা-ভাত খায় ওরা। আর রাতে তরকারি রান্না করে সেটা সকালে গরম করে মাহি’র দুপুরে খাওয়ার জন্য হটপটে রেখে দেয় আম্মু। সকালে, দুপুরে এবং রাতেও ভাত; তাতে শুধু এক পদের তরকারির আঁচড়টুকু থাকে। মাহি’র সবসময় ভয় করে এই বুঝি আব্বু অথবা আম্মু কারো রক্তে চিনির মাত্রা বেড়ে গেল !

                      মুভির অর্ধেক শেষ হয়েছে এমন সময়ে বেল বেজে উঠল। দ্রুত উঠে যেয়ে দরজায় দেখল। আব্বু বা আম্মু কেউ নয়; তাহলে বেল দিতনা। ওদের সবার কাছেই একটা কর চাবি  থাকে বাসার। কিন্তু নাহ ! দরজার ফুটোয় চোখ লাগিয়ে দেখল আম্মু দাঁড়িয়ে আছে।

-কি ব্যাপার ! চাবি ফেলে গেছে নাকি আজ !!

-তুমি বাসায় !

-হ্যাঁ , ক্লাস বন্ধ করে দিল তো । ছাত্রদের কি একটা আন্দোলন আছে..

কথা মুখেই থেকে গেল, মাহি থেমে গেল। কারণ দরজার ওপারে একজোড়া ঘৃণায় ভরা দৃষ্টি ওকে দেখছে।

-সরি..

-আজো ক্লাস পালিয়েছ ?

মাহি মাথা নিচু করে ফেলে।

-ক্লাস পালানো অন্যায় নয় তবে গুরুতর নয় , যতটা গুরুতর তুমি মিথ্যে যে অজুহাত দিলে সেটা। আশা করি ভবিষ্যতে এরকম হবেনা।  

অপরাধ-বোধে ছেয়ে গেল মাহি’র মন। আম্মু ঘরে চলে গেল ফ্রেশ হতে। যাবার আগে কিচেনে ঢুকে চুলোয় কি একটা বসিয়ে দিয়ে গেল। মাহি মাথা নিচু করে নিজের ঘরে যেয়ে ঢুকল। মুভিটা এখন পানসে লাগল ওর। টিভি বন্ধ করে দিল।

                    বিশ মিনিট পর দুটো  চেনা গন্ধে চোখ খুলে গেল মাহি’র। প্রথমটা আম্মুর ভেজা গায়ের গন্ধ আর দ্বিতীয়টা আলু-পরোটার গন্ধ। দুটো গন্ধই ওর অসম্ভব প্রিয়।

-নে খেয়ে নে। আমি রান্না করতে যাব।

-তুমি রান্না না করেই গোসল করে ফেললে যে ! আবার তো ঘেমে যাবে রান্না করতে করতে, তখন কি আবার..

মাহি’র মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মিসেস জান্নাত বললেন,

-নাহ ! আর গোসল করব না রান্না শেষ হলে। সময়ের সাথে তাল  মিলিয়ে চলতে শিখতে হবে তো !

ক্লাস- পালানো নিয়ে কিছুই বলল না আম্মু। এটাই মাহি’র কাছে আরও ভয়ের। আম্মুর কিছু না বলা মানে “আমি জানি তুমি কি অন্যায়টা করেছ, কিন্তু সেটার জন্য আজ তোমাকে কিছু বললাম না”। আম্মু খুব টেকনিক্যাল ওয়েতে শাসন করে ওকে। কিছু বলেনা, জোরে বকেনা; কিন্তু আচরণে প্রকাশ করে যে ও যা করেছে সেটা ঠিক করেনি। মাহি’র কষ্ট হল আম্মুর জন্য। অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে আর এসি’র বাইরে আসত না যে আম্মু সেই আম্মুকে এখন কত কষ্ট করে গরমে রান্না করতে হচ্ছে বলে। হাতে বানানো রুটি পাওয়া যায় পাশের হোটেলে। একটা সময় রাতে ওগুলো কিনে হটপটে রেখে সকালে খেত ওরা। কিন্তু সেগুলোর দামও হঠাৎ বেড়ে গিয়েছে। আগে পাঁচ টাকা দাম ছিল একটার ; এখন বেড়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ দশ টাকা হয়ে গিয়েছে। এখন সেটাও বন্ধ করতে হয়েছে বাধ্য হয়ে। ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল মাহি।

-এই গরমে তুই আবার এখানে এলি কে বাবা !

আম্মুদের পেছনেও বোধকরি দুটো চোখ থাকে। তা নাহলে ও পেছন থেকে এলেও আম্মু টের পায় কিভাবে !

-একটু হেল্প করি তোমাকে ..

-সোনা ছেলে আমার ! হেল্প করতে হবেনা আমাকে। তুমি পড়াশুনা কর যাও।

-শোন একটা কথা দিয়ে যাও।

চলেই আসছিল নিজের ঘরের দিকে মাহি। পেছন থেকে আম্মুর কণ্ঠ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল।

-বল।

-আমার কাছে আর কখনো মিথ্যে কথা বলবে না তুমি।

এরকম কিছুর আশংকাই ও করেছিল; যখনই শুনেছিল আম্মু ওকে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করছে। এই হল ওর আম্মু – বকবে না, হায়ে হাত দিবেনা – কিন্তু যা বলে বা করে তাতে ওর আত্মার পানি শুকিয়ে ফারাক্কা  হয়ে যায়। মাথা নিচু করে নিজের গিয়ে ঘরে

                    পরদিন মন দিয়ে ক্লাস করে সারাদিন। একটা ক্লাসও কেটে বাইরে বেরিয়ে যায় না। বন্ধু সালাম তো বলেই ফেলল একবার,

-কিরে ! আজ যে খুব ভাল ছেলে হয়েছিস !!

-ক্লাস কাটছি না কেন , এটা জানতে চাচ্ছিস তো ?

মাথা নেড়ে মাহি’র প্রশ্নের সত্যতা স্বীকার করল সালাম।

-চল ক্যাফেটেরিয়াতে বসবি একটু আমার সাথে।

-চল। এখন তো ক্লাস নেই। যাওয়া যায়।

-আসলেও তো চাচা এবং চাচী দুজনেই কত কষ্ট করেন তোর জন্য..

বন্ধুর কাছে গতকালের ঘটনা শুনে সালাম মন্তব্য করল।  

-সমস্যা আরও কোথায় জানিস !

-কোথায় ?

উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করল মাহি’কে।

-আব্বু আর আম্মু দুজনেই চাকরি করে বলে বাড়ির অন্য সদস্যদের অনেক চাওয়া থাকে ওদের প্রতি। কিন্তু আব্বু-আম্মু সেগুলো পূরণ করতে পারে না বলে কথা শুনতে হয় অহরহ। আর হঠাৎ জিনিসের দাম এত বেড়ে গেল যে !

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার  করল মাহি,

-কবে যে কমবে কে জানে ?

-কখনো শুনেছিস যেটার দাম একবার বাড়ে ,সেই জিনিসের দাম কখনো কমতে ?

-নাহ ! শুনিনি।

-একমাত্র পেঁয়াজ আর কাঁচামরিচের দাম ওঠানামা করে এদেশে।

ক্লাস শেষ করে কার্জন হলের গেট থেকে রিক্সায় উঠতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে নিজের নাম শুনল। এক পা রিক্সায় তুলে দিয়েছিল , আরেক পা মাটিতে ; সেই অবস্থায় ও সালামের দিকে ফিরে তাকাল। মহি’র আম্মু যেমন পেছন থেকে না দেখেও বুঝতে পারে ওর উপস্থিতি, তেমনি সালামের কণ্ঠও না ওকে না দেখেও বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়না মাহি’র।

                    এক মাস পর -   

            মিসেস জান্নাত অফিস থেকে ফিরে বাহিরের পোশাক ছেড়ে রানাঘরের দিকে দ্রুত যাচ্ছিলেন। মাহি আজ অনেক আগেই ফিরেছে বাসায়; ওর নাস্তা দিতে হবে। চা’টাও বানিয়ে খেতে চায়না অলস ছেলে। মনে মনে স্নেহের সাথে কথাগুলো বলতে বলতে এগুচ্ছিলেন। বাধা পেলেন রান্নঘরের মুখে যেয়ে। সামনে মাহি দাঁড়িয়ে। বলল,

-কোথায় যাচ্ছ ‘হার-হাইনেস’ ?

-কেন ! কোথায় আবার !! চুলোয় !!!

-যেতে হবেনা।

-মানে ?

অবাক হলেন মিসেস জান্নাত।

-বলছি ওদিকে যেতে হবেনা। তুমি তোমার ঘরে যাও।

-আর তোমার চা ..

-শুধু আমার নয় , তোমারটাও এসে যাবে। ‘আবরাকা ডাবরা , এই এখনই আম্মুর আর আমার চা-নাস্তা এসে যা’।

বলতেই সামনে একজন মাঝবয়সী মহিলা পরিস্কার ট্রে’র উপরে ধোঁয়া-ওঠা পকোড়া আর চা নিয়ে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল। মিসেস জান্নাত অবাক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন , তার দৃষ্টি একবার মাহি’র দিকে আর একবার ট্রে হাতে ধরা মহিলার দিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল।

-জননী  সব ঠাণ্ডা করে ফেলবে তুমি। চল ঘরে চল। আর ফুলি’র মা তোমাকে যেভাবে রান্না করতে বলেছি সেভাবে রান্না করতে শুরু কর। কিছু না বুঝলে আম্মুর সাথে পরামর্শ করবে।

-জী মামা।

                    নিজের ঘরে ঢুকে স্মার্ট ফোনটা দিয়ে স্মার্ট  টিভিতে কানেকশন দিয়ে সেদিনের না দেখা মুভিতে মনপ্রাণ দুটোই সঁপে দিল। অনেক হালকা লাগছে নিজেকে আজকে। সেদিন সালাম ওকে ডেকে পরামর্শ দিয়েছিল টিউশন করার। দুটো টিউশন যোগাড় করেও দিয়েছিল সেদিনই অনেক ঘুরে ঘুরে। তারপর দু জায়গা থেকেই এক মাসের বেতন হাতে পেয়ে সালামের সাহায্য নিয়েই ফুলি’র মাকে খুজে খুঁজে পেয়েছে। সকালে এবং সন্ধ্যায় কাজ করে দিয়ে যাবে – সকালের নাস্তা, সারাদিনের রান্না, বিকেলের নাস্তা, সকাল ও বিকেলের চা বানানো, ঘর মোছা, রোজকার কাপড় কাচা – মাহি’র এক মাসের টিউশনের টাকা দিয়ে ফুলি’র মায়ের বেতন হয়ে যাবে। মনে মনে সালামের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল মাহি। মাথায় স্নেহ মাখানো হাতের স্পর্শ পেয়ে বলল,

-আম্মু ! ভাল করে চুলগুলো নেড়ে দাওনা !!

-বুঝলি কি করে এটা আমার হাত ?

-তুমি যেভাবে আমাকে পেছন থেকেও চিনে যাও..। তাছাড়া বাসায় আর কেউ আছে নাকি যে মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে !

-ওরে দুষ্টু ছেলে , খুব দরকার বুঝি সেরকম কেউ !

-উঁ । পেলে মন্দ হত না। আপাতত আমার আম্মুর চুলে বিলি কেটে দেওয়াই উপভোগ করি । ‘আরাম, খাঁটি নারিকেল তেল’।

আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসে মাহি’র। আর অনেকদিন আগে শোনা নারিকেল তেলের বিজ্ঞাপনের লাইনটা মনে পড়তে মুখে এসে যায় ওর।   

ছোট গল্প - সুখের সীমানায় 

লেখক - জাকিয়া সুলতানা